The Violin Player (2016)

Screenshot (21).pngসত্যের পথে যাত্রা
The Violin Player (2016)
Dir : Bauddhayan Mukherjee

সিনেমা শুরু হয় একজন লোক উস্কো খুস্কো চেহারায় বিরস মুখে খবর কাগজ পড়ছে। অফ ফোকাসে তার স্ত্রী এর সাথে অল্প কথা বার্তায় জানা যায় তার চাকরি/কাজ অনিয়মিত তাই বাড়িতে বসেই তার বেশির ভাগ দিন কাটে এবং আর্থিক অনটনের মধ্যে সংসার চলছে। নেপথ্যের ঘরোয়া শব্দের থেকে একটি পুরুষ ও মহিলা কন্ঠের ঝগড়ার শব্দ যখন অসহ্যের পর্যায়ে পৌঁছায় লোকটির মুখে অত্যন্ত বিরক্তির ছাপ দেখা দেয় আর সঙ্গে সঙ্গে ব্ল্যাকআউট। সব বন্ধ। তারপর একটা একটা করে শব্দ যোগ হতে হতে শব্দ মিছিলে ঝগড়ার শব্দ ফিরে আসা মাত্র আবার পর্দায় আলো ফিরে আসে। স্ত্রী কাজে বেরিয়ে যায়। প্রতিনিয়ত ঘরোয়া কাজ কর্ম করতে করতে তার মধ্যেকার অসীম বিরক্তি আর রাগ এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে ঘরের একটি আরশোলা কে পাগলের মত বার বার মারার মধ্যে। আর তারপরেই একটি ব্ল্যাকআউট দিয়ে সিনেমার প্রথম অঙ্কের পরিসমাপ্তি ঘটে।

এই প্রথম অঙ্কের মধ্যেই রয়েছে সিনেমার সব উপাদান যা পরবর্তীতে সমস্ত চরিত্রগুলোর কাজকর্ম নিয়ন্ত্রন করে আর গল্পে অন্য মাত্রা যোগ করে।

একজন বলিউড সেশন ভায়োলিন বাদক এক রেল স্টেশনে হটাৎ একজন অজানা ব্যক্তির কাছ থেকে দ্বিগুন অর্থমূল্যে তার জন্য ভায়োলিন বাজানোর প্রস্তাব পেলে তার সাথে যেতে রাজি হয়। আর এই জার্নি তার কাছে প্রকাশ করে সংগীত, শিল্প, বেঁচে থাকার লড়াইয়ের আসল সত্য।

সিনেমার পুরো গল্পটাই বলা হয়েছে ভায়োলিন বাদকের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে। তাই পুরো সিনেমায় সে যা অনুভব করে, সে যা দেখে তাই আমরা দেখি। ভায়োলিন বাদক চরিত্রটি পলায়নপর প্রকৃতির। যখনই কোন অস্বস্তিকর অবস্থার সম্মুখীন হয় সে চোখ বন্ধ করে ওই অবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করে। আর যখনই চোখ বন্ধ করে তখনই সিনেমায় আমরা ব্ল্যাকআউট গুলো দেখি। সিনেমাতে মোট পাঁচটি ব্ল্যাকআউট রয়েছে। আর এই ব্ল্যাকআউট গুলো সেই পয়েন্ট যেখান থেকে গল্প এক অঙ্ক থেকে আরেক অঙ্কে এগিয়ে যায়। আবার প্রতিটি অঙ্কের মধ্যেই রয়েছে ছোট ক্লাইম্যাক্স আর তার পতন। এমন নয় যে একটা পুরো অঙ্ক তৈরি করা হয়েছে ক্লাইম্যাক্স তৈরির জন্য আবার তার পতনের জন্য আরেক অঙ্ক। সিনেমায় মূলত দুটি চরিত্র। আর এই দুটি চরিত্র গঠন এর ক্ষেত্রে রহস্যময় পরিচালক এর চরিত্র গঠনে সবচেয়ে বেশি মুন্সিয়ানা দেখা যায়। একজন অজনা রহস্যময় ব্যক্তির সঙ্গে ভায়োলিন বাদকের অনির্দিষ্টের পথে যাত্রা পুরো সিনেমাতে সাসপেন্স বজায় রেখেছে। প্রতিটা দৃশ্যেই মনে হবে এর পর কি অপেক্ষা করে আছে।

ঋত্বিক চক্রবর্তীর একজন অসফল, হতাশাগ্রস্ত বাঙালি শিল্পীর চরিত্রে অভিনয় এ ছবিটি অন্যতম সম্পদ। ভায়োলিন বাদক হিসেবে ভায়োলিন ধরার ভাবভঙ্গি, ছড় টানা, বা বাজানো অতিমাত্রিক নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আদিল হুসেন তার শীতল চাহনি, মুখ ভঙ্গির অতি অল্প বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে স্বল্পভাষী, আত্মমগ্ন, রহস্যময় পরিচালকের চরিত্র কে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন। তার গায়ের কালো রং এই ডার্ক শেডের চরিত্রকে যেন অন্য স্বাদ দিয়েছে।

মুম্বাইয়ের কোলাহল, যানবাহনের শব্দ এই ছবির অবিচ্ছেদ্য আবহসংগীত হয়ে উঠেছে। এই শব্দ এত বিশদ এবং জীবন্ত যে দর্শককে দৃশ্যের সঙ্গে একাত্ম করে তোলে। চরিত্রের অনুভূতি প্রকাশ করার ক্ষেত্রেও এই শব্দ সুকৌশলে ব্যবহার করা হয়েছে। শব্দে এত ডিটেইলস আছে যে এমন কি রেলষ্টেশনের এত কোলাহলের শব্দের মধ্যেও আদিল এর চামড়ার জুতো বা ঋত্বিকের জুতোর শব্দ যোগ করা হয়েছে। আবহ সংগীত হিসেবে বাদ্যযন্ত্র সংগীতের ব্যবহার খুবই পরিমিত এবং যথাযত। টিপিক্যাল বলিউড সাউন্ডট্র‍্যাক তৈরি কিংবা ট্রেনে ভাওলিন বাদকের কল্পনায় বেজে ওঠা ব্রাহমস্, মোজার্ট আর তাইকোভস্কির সুর মিলিয়ে তৈরি ভায়োলিন পিস্ সংগীত পরিচালকের দক্ষতা প্রকাশ করে বা শেষ অংশে ভাস্কর দত্তের অনবদ‍্য আবেগময় ভায়োলিন পিস্ অসাধারন।

সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যে রয়েছে উঁচুমানের রঙের ব্যবহার। বদ্ধ ভগ্ন ঘরের মধ্যে অসাধারণ আলো-আঁধারি পরিবেশ সৃষ্টি ও সেই আলোয় ঘরের পরিবেশ এবং চরিত্রগুলির অভিব্যক্তি নিখুঁত ভাবে ক্যামেরায় ফুটিয়ে তোলা অভীক মুখোপাধ্যায়ের চিত্রগ্রহনের অসামান্যতা প্রকাশ করে।
ভায়োলিননবাদকের একঘেয়েমি জীবনের প্রতি বিরক্তি বোধ, অন্তরের নৈরাশ্য, কিভাবে চারপাশের পরিবেশ তাকে জাঁকিয়ে ধরেছে, ঘরের ও শহরের পেছনের ঘিঞ্জি পরিবেশ কে প্রকাশের জন্য ক্লাস্ট্রোফোবিক ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলস্ এবং চরিত্রগুলির অনুভূতি মুখের অভিব্যক্তি দ্বারা প্রকাশের জন্য ক্লোজ আপ শটের ব্যবহার রয়েছে।

ফর্মাল পোশাক হিসেবে পাঞ্জাবি আর ইনফর্মাল হিসেবে ফতুয়া বাঙালি শিল্পীর পোশাক রুচির যথাযত প্রকাশ। আদিলের জন্য সাদা জামা আর কালো প্যান্ট এর থেকে ভালো পোশাক আর কি হতে পারত আমার জানা নেই। আদিলের পোশাকের মধ্যে একটা আয়রনি রয়েছে। সাদা জামা তার ডার্ক শেডের চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গে এক বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। এই বৈপরীত্য তার চরিত্রের লুকস্ কে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে।

ছবির সংলাপ খুবই যত্ন সহকারে লেখা হয়েছে।আদিলের মুখের খুবই অসম্পূর্ন এবং হেঁয়ালীপূর্ন সংলাপ চরিত্র কে রহস্যময় করে তুলেছে এবং পুরো ছবিতে উত্তেজনা ধরে রাখার অন্যতম উপাদান। ছবির প্রথম দৃশ্যে ভায়োলিনবাদক আর তার স্ত্রী এর মধ্যে একটু দুটি বাক্যের বার্তালাপ তাদের সম্পর্কের অবস্থার কথা পরীক্ষার ভাবে প্রকাশ করে। ঋত্বিকের একজন মুম্বাই প্রবাসী বাঙালী হিন্দি উচ্চারণ বা কথা মধ্যে বাংলা শব্দের প্রয়োগ নিখুঁত।

সচিন ভাইলারের শিল্প নির্দেশনা এবং মোনালিসা মুখার্জীর প্রোডাকশন সজ্জা বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য। পরিচালক বৌদ্ধায়ন মুখার্জীর প্রতিটি দৃশ্যে যে পরিমান ডিটেইলস এবং পুরো গল্প কে যে ভাবে ধরে রেখেছেন তার পরিচালনার অসাধারনত্ব প্রকাশ করে।

এই সিনেমার গল্প ছুঁয়ে যায় শিল্প ও শিল্পীর সম্পর্ক, শিল্প কেমন ভাবে সৃষ্টি হয়, কোথা থেকে আসে শিল্পের প্রেরণা, বর্তমানে ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র শিল্পীদের অবস্থা, বেঁচে থাকার লড়াই, কেমন ভাবে শহরেরর চার দেওয়ালের মধ্যে থাকা দম্পতি একে অপরের কাছে অজানা থেকে যায়।

Design a site like this with WordPress.com
Get started